হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবার ও শিশু প্রতিপালনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলী তারাশিয়ুন এ বিষয়ে অভিভাবকদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
একা ঘুমাতে ভয় পেলে কী করবেন?
প্রশ্ন: আমার আট বছর বয়সী ছেলে একা নিজের ঘরে ঘুমাতে ভয় পায়। বিশেষ করে বর্তমান যুদ্ধাবস্থার কারণে সে বেশ উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত। এ অবস্থায় আমি কী করতে পারি?
উত্তর: হযরত আলী (আ.)-এর একটি বাণী রয়েছে, যার মর্মার্থ হলো—ভয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার চাহিদাকে জাগ্রত করে। তাই যখন কোনো শিশু ভয় পায়, তখন সেটি সাধারণত তার নিরাপত্তাবোধে ঘাটতির লক্ষণ। এ কারণে অভিভাবকদের উচিত শিশুর মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া এবং তাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে দিতে সহায়তা করা।
যুদ্ধ বা অন্য কোনো সংকটময় সময়ে শিশুর ভীতি ও উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। প্রয়োজনে বাবা-মা কিছু সময় সন্তানের ঘরে অবস্থান করতে পারেন কিংবা তার পাশে বসে বা শুয়ে তাকে আশ্বস্ত করতে পারেন। শিশু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে তারা নিজ কক্ষে ফিরে যেতে পারেন, অথবা পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু সময় তার কাছেই থাকতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর ভয়কে অস্বীকার করা বা তুচ্ছজ্ঞান করা যাবে না। অনেক অভিভাবক বলেন, “ভয়ের কিছু নেই”, “এত ভয় পাও কেন?”, “তুমি তো বড় হয়ে গেছ” কিংবা “তুমি তো ছেলে মানুষ”। এ ধরনের কথা শিশুর উদ্বেগ কমায় না; বরং তার ভেতরের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বরং তাকে আদর করা, বুকে টেনে নেওয়া, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়াই কার্যকর পন্থা। শিশুর আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া তার মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, শিশুকে বাবা-মায়ের শোবার ঘরে এনে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি না করাই ভালো। কারণ, পরে সেই অভ্যাস থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর পরিবর্তে প্রয়োজন হলে বাবা-মা সন্তানের ঘরে গিয়ে কিছু সময় অবস্থান করতে পারেন। এতে বর্তমান সমস্যার সমাধান হবে, আবার নতুন কোনো নির্ভরশীলতাও তৈরি হবে না।
অনলাইন ক্লাসের কারণে মোবাইল আসক্তি রোধে করণীয়
প্রশ্ন: আমার সন্তান ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বর্তমানে তার ক্লাস ও পড়াশোনা অনলাইনে হচ্ছে। কীভাবে তাকে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা যায়?
উত্তর: প্রথমত, সম্ভব হলে সন্তানের জন্য আলাদা মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়াই উত্তম। পরিবারের বিদ্যমান ফোন—যেমন বাবা, মা বা বড় ভাইবোনের ফোন—নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করে পড়াশোনার কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে।
করোনাকালীন অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে অনেক পরিবার সন্তানদের হাতে ব্যক্তিগত মোবাইল তুলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা পরিবারে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। শিশু যেন প্রয়োজনের বাইরে বা ইচ্ছামতো যে কোনো সময় ফোন ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। কতক্ষণ এবং কোন উদ্দেশ্যে ফোন ব্যবহার করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদেরও পাঠদান ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করা উচিত। এতে শিশুদের দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনের সংস্পর্শে থাকতে হবে না।
মোবাইল ফোনের বিভিন্ন আকর্ষণীয় উপাদান শিশুদের সহজেই আসক্ত করে তুলতে পারে। এই আসক্তি শুধু আচরণগত সমস্যাই সৃষ্টি করে না; বরং তাদের নৈতিক বিকাশ, মানসিক গঠন, ধর্মীয় ও মূল্যবোধগত চিন্তা এবং শিক্ষাগত অগ্রগতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, পড়াশোনা ও বাড়ির কাজ যতটা সম্ভব খাতা-কলমনির্ভর রাখার চেষ্টা করা উচিত। অর্থাৎ, শিশু যেন লেখালেখি, অনুশীলন ও অ্যাসাইনমেন্টের কাজ কাগজে-কলমে সম্পন্ন করে। এতে ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা কমবে।
সবশেষে, যুদ্ধ, মহামারি বা অন্য যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতেও শিশুদের বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা প্রয়োজন। ঘরের ছোটখাটো কাজ, বাজার করা, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা কিংবা অন্যান্য বাস্তব অভিজ্ঞতায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া উচিত।
শিশু যেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত “পড়াশোনার অজুহাতে” মোবাইল ফোনে ব্যস্ত না থাকে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বাস্তব জীবনের সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখে এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
আপনার কমেন্ট